Skip to main content

"সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো"

 ইন্টার্নশিপের সময় আমি বেতন পেতাম না। তখন বাংলামোটরের ঐদিকে একটা টিউশনি করে চলতাম। মগবাজার ওয়্যারলেসের রাস্তাটা পার হয়ে সোজা হেঁটে যেতাম, ওটাই ছিল আমার নিয়মিত চলাচলের পথ। একদিন কী ভেবে যেন টিউশনিতে গেলাম না। সন্ধ্যার পরে একটা বিকট শব্দ হলো। বাসা থেকে বেরোতেই দেখি দলে দলে মানুষ ওয়্যারলেস গেটের দিকে ছুটে আসছে। এতদিন এই এলাকায় থাকি, এরকম কখনও দেখিনি। শুনলাম মগবাজার আড়ঙ এর অপরপাশে কিছু একটার বিস্ফোরণ হয়েছে, কিসের থেকে হলো তা তখনও অজানা। আহতরা দলে দলে আমাদের হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ছুটে আসছে। আমিও ছুটে গেলাম সাহায্য করতে। গিয়ে দেখি সামি, সাবিনা, শ্রেয়াদের অ্যাপ্রন রক্ত আর ঘামে একাকার। Severely injured পেশেন্টদের একদিকে স্টিচ দিচ্ছি, অন্যদিকে ব্যান্ডেজের জন্য দৌঁড়াচ্ছি। এমন সময় একটা দুই বছরের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে একজন দৌঁড়ে এলো, সম্পর্কে সে বাচ্চাটির মামা। বোন আর ভাগ্নেকে নিয়ে আড়ঙ এর উল্টোপাশে একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে খেতে এসেছিলেন, বোনটা ইতোমধ্যে মারা গেছে, বাচ্চাটাও মৃত। তবুও আশা করে এসেছেন, যদি বাঁচানো যায়। বাচ্চাটার দিকে তাকালাম, দেহে প্রাণ নেই, সারা শরীরে কাচের টুকরো বিঁধে আছে। একটা একটা করে কাচের টুকরো বাচ্চাটার শরীর থেকে বের করলাম। রোগীর ভিড়ে মৃত বাচ্চাটাকে বেশিক্ষণ অবজারভেশন বেডে রাখতে পারলাম না, তখন যাদের বাঁচার সুযোগ আছে তাদের সুযোগ দিতে হবে, এটাই মেডিকেল ইথিক্স৷ রাতে ঘুম হলো না, বারবার বাচ্চাটির মুখ চোখে ভাসছিল। পরেরদিন ডিউটিতে এলাম, সবার মুখে শুধু ঐ দুর্ঘটনার কথার পুনরাবৃত্তি চলছে। আমার অত্যন্ত কাছের এক বন্ধু আমাকে বলে বসলো, "দেখেছো? বিশ্বাস তো করতে চাও না। প্রতিদিন ঐ রাস্তা দিয়েই যাও, কাল যাওনি। কত বড় ফাঁড়া থেকে "উনি" তোমায় বাঁচিয়ে দিলেন, শোকর করো।" কোনো উত্তর দিলাম না। মনে কেবল একটা প্রশ্নই বারবার বাজতে থাকলো - আমাকে বাঁচানোর ক্রেডিট যদি "উনি" নেন, মা সমেত ঐ অবুঝ বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার দায়ও "তাঁর" নেয়া উচিৎ, নয় কি?

Comments

Popular posts from this blog

নৈতিকতার পাঠ; পুরস্কারের লোভ নাকি শাস্তির ভয়?

 ছোটবেলা থেকে আমরা একটা কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি - সকল ধর্মই নৈতিকতার কথা বলে, সকল ধর্মই খারাপ কাজ করতে নিষেধ করে। কথা ১০০ ভাগ সত্য। কীভাবে করে? ধর্ম এই নৈতিকতার পাঠ কীভাবে পড়ায়?  প্রায় প্রতিটি ঈশ্বরবাদী ধর্মে জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয় - ১) ইহকাল এবং ২) পরকাল। ব্যাপারটা কিছুটা এইরকম যেন ইহকাল হলো মানুষের পরীক্ষার জায়গা। এখানে মানুষের নানান বিষয়ে বিশেষ করে নৈতিকতার পরীক্ষা হবে (পশুপাখির আবার পরীক্ষা হয় না)। ইহকালের এই পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যাবে পরকালে অর্থাৎ  মৃত্যুর পর। ব্যাপারটা বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্নভাবে এলেও মোটাদাগে এসব পরীক্ষার ফলাফল হচ্ছে দুটো - স্বর্গ আর নরক, মাঝামাঝি আর কিছু নেই। ভালো কাজ করলে আপনি পাবেন স্বর্গের গ্যারান্টি আর খারাপ কাজ করলে পাবেন নরকের কষাঘাত। আবার  কিছু অপরাধের ফলাফল কিংবা পূণ্যের সুবিধা ইহকালেও পাওয়া যায়। প্রকৃতি নিজেই বিচারক হয়ে নাকি বিচার করে দেয়। এছাড়াও রয়েছে ঈশ্বরকে নানাভাবে খুশি করার উপায়। কিছু কিছু কাজে ঈশ্বর খুশি হন, আবার কিছু কিছু কাজে নারাজ হন। তা যাই হোক, এই বর্ণনা মোটামুটি সব ধর্মেই কমন (বৌদ্ধধর্ম আর জৈনধর্ম বাদে)। একটু খেয়াল কর...

বাংলা ঘর এবং তার ইতিবৃত্তান্ত

"বাংলা ঘর" শব্দটি অামরা অনেক হিন্দী সিনেমা কিংবা নাটকে শুনে থাকি। অামি অাগে মনে মনে প্রশ্ন করতাম, এই "বাংলা ঘর" এর সঙ্গে কি বাংলার কোনো সম্পর্ক অাছে তাহলে? ড. মুনতাসীর মামুনের "ঢাকা সমগ্র ৪" পড়ার পর এ ব্যাপারে অামার ধারণা পরিষ্কার হয়। ড. মুনতাসীর মামুন তাঁর "ঢাকা সমগ্র" সিরিজের বইগুলোতে ঢাকার অাদি ইতিহাস, জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর পরিবর্তনগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ইচ্ছে করলে বইটি পড়ে ঢাকা সম্পর্কে অারো গভীর ধারণা পেতে পারেন। লেখকের মতে,  তৎকালীন বাংলার ঘর তৈরির এক বিশেষ রকম শৈলীর জন্যই এর নাম "বাংলা ঘর"। মুঘল শাসকগণ বাংলায় অাসার পর ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করেন। কিন্তু বাংলার বেশিরভাগ জনসংখ্যাই ছিল গ্রামগুলোয় স্থায়ী। কিন্তু ঢাকাকে রাজধানী করতে হলে সেখানে লাগবে জনবসতি, লাগবে হাটবাজার, দোকানপাট। এমতাবস্থায় মুঘল শাসকগণ ঢাকায় জনবসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে লাখেরাজ সম্পত্তি দান করেন। এসব জমিতে রাজস্ব ছাড়াই বসবাস করা যেত। মুঘল অামলে ঢাকায় জনবসতি তৈরির মূল কারণই ছিল এই লাখেরাজ সম্পত্তি।  গৃহনির্মাণশৈলীর পেছনে পৃথিবীর সব জ...